মাঠ ও মাঠের দখল

কয়েক বছর আগে, মার্কিন নগর পরিকল্পনাবিদ গ্যারি হ্যাকের সাথে গল্প চলছিল শহরের পার্ক আর খেলার মাঠের “দখল” নিয়ে। উনি বললেন এই সমস্যা শুধু ঢাকার না, দুনিয়ার সব বড় শহরেই মাঠগুলো বিভিন্ন ক্লাবের দখলে চলে যায়; সাধারণ মানুষ, এলাকার বাচ্চাকাচ্চারা মাঠে খেলতে পারে না। 

জানতে চাইলাম এর সমাধান কী হতে পারে। উনি মৃদু হেসে বললেন, এর একটা জনবান্ধব দুষ্ট সমাধান হচ্ছে মাঠ এবং পার্কগুলোকে ছোট ছোট বৈচিত্রে সাজানো। কিছু গাছপালা, লেক, ফোয়ারা, বাগান, দৌড়ানোর পথ, বাচ্চাদের খেলনা—এগুলো দিয়ে বড় যায়গাগুলো ভেঙে বিভিন্ন বয়সীদের জন্য বৈচিত্রময় খেলাধুলার ছোট ছোট যায়গা বানাতে হবে। তাহলে সেই পার্ক বা মাঠ ক্লাবগুলো দখল করতে পারে না। ফুটবল বা ক্রিকেট খেলার মত বড় খোলা মাঠ থাকলেই সেখানে কোন না কোন দল বা ক্লাব মাঠের দখল নিয়ে সাধারণ জনগণের সহজগম্যতায় বাধা দেয়, এগুলো ছোটদের, বুড়োদের ও নারীদের ব্যবহারের উপযোগী থাকে না। 

ক্লাবের বা পেশাদার দলের জন্য বড় খোলা মাঠের দরকার আছে, কিন্তু সেটা পাড়ার মাঠ হতে পারবে না; পাড়ার মাঠ ও পার্ক সবার জন্য উন্মুক্ত রেখে বড় খেলার মাঠ আলাদা করতে হবে। এদুটোর সহাবস্থান চলে না।

কয়েকদিন আগে এরকম একটা অন্যায় দখলের সাথে অনভিপ্রেত সাক্ষাৎ ঘটলো বনানী ১ নম্বরের চেয়ারম্যানবাড়ি মাঠে। বাসার কাছে হওয়া সত্বেও কেন যেন এই মাঠে কোনদিন যাওয়া হয়ে ওঠেনি। গত সপ্তাহের কোন এক সন্ধ্যায় আমি আর আমার এক বিদেশি বন্ধু র‍্যাকেট হাতে বের হলাম—উদ্দেশ্য আলোকিত কোন খোলা যায়গা পেলেই কর্কে একটু বাড়ি দিব, নেট-ফেট লাগবে না, এমনি ঠোকাঠুকি খেলা। আমরা হাঁটতে হাঁটতে চেয়ারম্যানবাড়ি মাঠে ঢুকলাম। মাঠের এক কোনায় রাস্তার আলোতে আমরা খেলা শুরু করলাম।

কিছুক্ষণ পরে দুজন লোক এসে বললেন, এখানে খেলা যাবে না। আমি বললাম, খেলার মাঠে খেলা না গেলে আর কোথায় খেলা যাবে? উনারা বললেন, কমিটির নির্দেশ, এখানে খেলা যাবে না, বাইরে নিয়ম কানুন লেখা আছে। আমি বললাম, কমিটিকে বলেন দুইজন মানুষ মাঠে ব্যাডমিন্টন খেলছে, তাদেরকে তাড়ানো যাচ্ছে না। অথবা কমিটির কারোর ফোন নাম্বার থাকলে দিন, আমি কথা বলতে চাই। 

উনারা কথা না বাড়িয়ে চলে গেলেন। আমরা খেলা চালিয়ে গেলাম।

মিনিট পনেরো পর তিনজন হাজির হলেন, এক ভদ্রমহিলা, একজন বয়স্ক ভদ্রলোক আর একজন শন্ডামার্কা যুবক। মাস্কের আড়ালে চেহারা দেখা গেল না; তবে কথায় বোঝা যাচ্ছে তাদের চেহারায় বিরক্তি আর কর্তৃত্বের দম্ভ মাখানো আছে। 

বেশ কিছুক্ষণ তর্ক বিতর্ক চললো। আমি জানতে চাইলাম পাবলিক পার্কে খেলতে বাধা দেওয়ার অধিকার আপনাদেরকে কে দিল? উনারা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পরেশনের মেয়রের কথা বললেন। এই মাঠ না কি শুধুমাত্র ক্রিকেটের জন্য বরাদ্দ, “অন্য যে কোন কর্মকান্ড করতে হলে ১৫ দিন আগে অনুমতি নিতে হবে”। I am not kidding, they actually said this. আমি বললাম, আপনাদের এই দখল অন্যায়, অবৈধ; আদালতে চ্যালেঞ্জ করলে আপনারা হেরে যাবেন। আর ব্যাডমিন্টন আবার “কর্মকান্ড” হলো কিভাবে, যার জন্য অনুমতি নিতে হবে?!

উনারা বারবার বললেন বাইরে নাকি লেখা আছে নিয়ম। আমি বাইরে গেলাম, তাদের কুৎসিৎ নিয়ম কানুনের ঠিকুজি পড়লাম (ছবি কমেন্টে)। বমি পেলো, রাগ হলো। যদিও নিয়মে কোথাও বলা নায় মাঠে ব্যাডমিন্টন খেলা যাবে না, বা খেলতে অনুমতি নিতে হবে। আমি নিয়ম কানুন পড়ে ফিরে এলাম, বললাম আপনারা মিথ্যা বলেছেন। আপনাদের নিয়মে এমন কোন কথা নাই যার আওতায় আপনি আমাদেরকে মাঠ থেকে তাড়াতে পারেন। এরপর যা হলো তা মাস্তানি, শন্ডামার্কা যুবক “দেখে নেওয়ার” হুমকি দিলেন। বয়স্ক ভদ্রলোক একটু অস্বস্তি নিয়ে বললেন, আপনাদের খেলা বন্ধ করে দিয়ে আমাদের কোন আনন্দ হচ্ছে না। কিন্তু আপনাদেরকে খেলতে দিলে আরও অনেক গ্রুপ নেট, লাইট নিয়ে খেলতে হাজির হবে, ক্রিকেট মাঠটা নষ্ট হবে। আমি বললাম, তাই তো হওয়ার কথা! সবাই খেলবে বলেই তো মাঠ! সবাইকেই আসতে দিন, খেলতে দিন, আর খেলতে না দিলে আপনাদের লম্বা নিয়ম কানুনে সে কথা পরিষ্কার করে লিখে দিন। নিয়ম তো আর কম লেখেননি, আরেকটা জুড়ে দিলে অসুবিধা হবে না।

চেয়ারম্যানবাড়ি (শহীদ যায়ান চৌধুরী মাঠ) এর নিয়ম কানুন, বানানী ১ নম্বর রাস্তা

যাই হোক, আমরা আর কথা না বাড়িয়ে চলে আসলাম। কারণ আমি জানি এই লড়াই লড়ে কোন লাভ নাই ঢাকায়। ধানমন্ডি ৮ নাম্বারের মাঠের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি হৈচৈ, আন্দোলন, মামলা, আদালত, হাই-কোর্টের রায় কোন কিছুই মাঠকে দখলমুক্ত করতে পারেনি। We have been there, done that, and failed. It’s a lost cause.